ও মাই ঘড ৭

মিনি পর্দা সরিয়ে উঁকি দিয়ে বলল : ফেসবুক করছ তো ? ঠিক জানি ফেসবুক করছ । আজকে সবাই ফেসবুক করছে । তেড়ে খিস্তি দিচ্ছে ,  দার্শনিকতার বুলেট চলছে : ড্যগা ড্যগা ড্যগা ড্যগা । এতোদিনে একটা নতুন দর্শনের সন্ধান পেয়েছে মানুষ ।  আমি মোবাইল থেকে চোখ তুলে জিজ্ঞেস করলাম , কী দর্শন ?  মিনি বলল,  ওমা এখনও জানোনি ? কুচুটে দর্শন ।
এসব ভাট বকায় পাত্তা দেওয়ার দরকার নেই বুঝে আমি আবার মোবাইলে চোখ রাখলাম । মিনি শুয়ে পড়ে আমার আর মোবাইলের মাঝে মাথা গলিয়ে বলল ,  জানতাম রানু মণ্ডলের ভিডিওই দেখছ ।  আমি বললাম , দেখেছিস তুই ? কি অকৃতজ্ঞ মহিলা , ভাবা যায় !  আমি ভাবতেই পারছিনা , যে  ছেলেটা রাস্তার ভিখিরি থেকে গাইকা বানালো , আজ কিনা তাকে 'ভগবানের চাকর' বানিয়ে দিলো ! ছিঃ ! 
মিনি বলল, স্টারেদের ওইটুকু ভাও তো থাকেই ।
স্টার ?  তেরি মেরি তেরিমেরি ... ওইটুকু গেয়েই স্টার ? আর হাসাস না মিনি ! 
মিনি নিজেই খানিক হেসে নিয়ে বলল ,  কদিন আগে যে রিয়েল স্টার , রিয়েল ট্যালেন্ট ইত্যাদি হ্যাসট্যাগ দিয়ে তার গান শেয়ার করছিলে বড় !
  আমি বললাম,  আমি করিনি । শেয়ার করার মতো তেমন কিছু বলে মনেই হয়নি । একটা হুজুগ চলছে , তো চলছে । তা নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার আছে বলে মনে হয়নি । মিনি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল , কিন্তু এখন মাথা ঘামানোটা দরকারি বলে মনে হচ্ছে বলো ! হ্যাসট্যাগ  সেম অন ইউ পোস্ট করার ইচ্ছে হচ্ছে বলো ?
তা হচ্ছে । কোথায় ছিল রানু মণ্ডলের ভগবান, যখন রাস্তায় ভিক্ষে করছিল ?  তার মেয়ে নাকি টাকা পাঠাত ! মানুষের এমন কৃতঘ্নতা দেখে গা রিরি করে উঠছে ।
মিনি আমার কথা শুনে হাসতে হাসতে বলল , গা রিরি করছে এটাই একমাত্র সত্যি কথা ।  বাকি সত্যিটা আমি বলি : গা রিরিটা কৃতঘ্নতা দেখে করছে না । চোখ গোল গোল করে রোডিস , স্প্লিটসভিলা, বিগ বস দেখা মানুষের এইটুকুতে গা রিরি করবে ! কি আশ্চর্য ! আসল কথাটা কি জানো তো ,  তোমার বাড়ির কাজের লোকটার চেয়েও খারাপ অবস্থা থেকে উঠে আসা মানুষটার জীবন তোমার স্বপ্ন জীবনের চেয়েও অনেক ওপরে উঠে গেছে । তাই কাদা ছুঁড়তে ইচ্ছে করছে তোমার । বলতে ইচ্ছে করছে , শালি ছোটলোক ভিখিরি খুব উড়ছিস , আবার পাঁকে পড় ।  কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারছ না । তাই বলছ , ' এইবার আসল রূপ সামনে আসছে'  , ' ছোটলোক সবসময় ছোটলোকই থাকে ' কিংবা ' অতীন্দ্রর আর তাকে সাহয্য করা উচিত নয়' ইত্যদি । আর সবকিছুর সার সংক্ষেপ : মানুষের উপকার করা উচিত না । যেন এই ঘটনা দেখার আগে মাদার টেরেজা সাজার পরিকল্পনা ছিল । মোদ্দা কথা হলো : শ্রেণি .... অতীন্দ্রদের সঙ্গে তুমি একাত্মতা অনুভব করতে পারো ,  আর রানু মণ্ডলদেরকে করুণা করতে পারো । তাদের মাথা হেঁট রাখাটাই রীতি । ভিক্ষের থালা হাতে থাক বা নাই থাক ভিখিরির বিনয়ের বাইরে বেরোলেই সেটা আর মেনে নেওয়া  যায় না । মনে হয় ছোটলোকের এতবড় স্পর্ধা ! গা রিরি করে ওঠে ।  কিন্তু এমন স্পর্ধা আর কৃতঘ্নতার ছবি কত কত ভদ্দরলোক নিত্য দেখিয়েই চলেছে , সেগুলো হজম করতে আমাদের কোনও কষ্টও হয়না ।  আর পাশাপাশি কুচুটে দর্শন তো আছেই । রূপকথার সিরিয়াল দেখে আর কজনেরইবা মন ভরে ? তারমধ্যে একটু কূটকচালির মশলা না পড়লে ঠিক জমে না ।  তাই শুরু থেকেই তার গানের শেয়ারের চেয়েও বোধয় বেশি শেয়ার হয়েছে তার মেয়ের ফিরে আসার খবর ।
অন্য মানুষ যে আসলে কত ছোট , কত নীচ... এটা প্রমাণ করার মতো আনন্দ আর কিছুতেই নেই । এতে অন্তত এটুকু আত্মারতি মেলে --- যাক বাবা !  পৃথিবীর সবচেয়ে ইতর অভদ্র কৃতঘ্নতম মানুষটা আমি নই ।  আঃ ! কি শান্তি ! 

Comments