একটাই মোটে জীবন

একটাই মোটে জীবন , আর মৃত্যু বহুবার ।

অনেক দিনের হাঁটার পরে পায়ের ফোস্কা যেই
চোখ রেখেছে চোখে তাকে কান্না শেখাতেই ,
অমনি চোখ স্থির হয়েছে , এসেছে অন্ধকার ।
একটাই মোটে জীবন , আর মৃত্যু বহুবার ।

তার ছাদের কোনায় হলদে গোলাপ টবেই ফুটেছিল ,
আর রোজ বিকেলের প্রেম বিনিময় কত দিন ধরে ছিল !
তবু একটা দিন সে শুকিয়ে গেল , শূণ্য টবের ঘর ।
একটাই মোটে জীবন , আর মৃত্যু বহুবার ।

তার স্কুলের বন্ধু , কুলের আচার ভাগ করে খাওয়া সাথী ,
গ্রিটিংস কার্ডে 'প্রিয় বন্ধু' , খাতা ভরা কাটাকুটি ।
সেও একদিন প্রেমবন্দী , খুলল না তার ঘর ।
কড়া নেড়ে নেড়ে ফিরতেই হলো,  মৃত্যু হলো আবার ।

কোঁচোড় ভরা ইঁদুর দুটোর মাথায় নাচানাচি
সহ্য করে ঘুমোলে -- আসে বুকের কাছাকাছি ।
তারা শীতকাতুরে ভেবে নিয়ে ধরে রোদেতে দেয়ার  পর ---
লাল চোখগুলো ঘোরে বুঁজে এলো , মৃত্যু হলো আবার । 

তার রূপকথারা মেলতো পাখা, ব্যঙ্গমাদের বুলি
উজাড় করে দিত ঠাকুমা , খুলত যখন ঝুলি ।
স্কুলে ছিল বলে দেখা হলো না দুজনের শেষবার ।
নোটে গাছটা মুড়লো । তারও মৃত্যু হলো আবার । 

সে বড় হয়ে গেল , রূপকথা নয় বাস্তবেতে পা ।
প্রেম আসাআসি শেষ হলে পরে ঘর বেঁধে নিতে যা !
তার বাবা-মার প্রিয় বন্ধু চলল তেরো নদ-নদী পার ।
একটাই মোটে জীবন ?  আর মৃত্যু ?  বহুবার । 

তার সংসার হলো বড় মাখামাখি , সবাই বড়ই ভালো । 
কুকুর ছানাটা মাতিয়ে রাখতো ছুটির দুপুর গুলো ।
কী করে যে তার ইচ্ছে হলো শিশুকে কামড়াবার !
তাড়িয়ে দেওয়া কুকুরও কি মরে গ্লানিবোধে বারবার ? 

সবকিছু ভুলে সন্তান ঘিরে চলছে জীবন ভালো ।
সেও বলে --- "শুঁয়োপোকা মেরো না গো ,  প্রজাপতি বড় ভালো " ।
এতো সুখ ভেঙে খবর এলো বাবা-মা মারা যাবার ।
জীবন কি আছে একটাও ?  আর মৃত্যু ?  বারবার ?


তার বয়স হয়েছে ,  ভেউ ভেউ করে কান্নাযাপন শেষ ।
চলে গেছে দূরে কষ্ট পাওয়ার পুরনো বদভ্যেস ।
পায়রারা বাড়ি ছেড়ে চলে গেলে , ফুল ঝরে গেলে আর
মৃত্যু হয়না বুঝেছে,  জেনেছে কৌশল বাঁচাবার ।

তার ছেলে আর বর ভোরে বেরিয়েছে ,  বেলা গড়িয়ে দুপুর ,
খুঁজতে গিয়ে চমকে দেখলো ---- সঙ্গে সেই পোষা  কুকুর ।
গাড়ির চাপে ভেঙে যাওয়া পা শুশ্রূষা করবার
ভার নিয়েছিল ,  সাহস পায়নি তাকে কিছু জানাবার ।

সে কাঁদতে চাইল --- কবে থেকে সে এমন মানুষ হলো ?
ঠাকুমা ফুলেরা হাসি নিয়ে গেছে ,  বাবা-মা কান্না নিলো ।
সব মৃত্যু কিছু নিতে নিতে আজ সে শক্ত খুব ।
পরিণত , লোকে জীবিতই জানে , হোক না শূন্য বুক ।

সে বেরিয়ে পড়ল , মৃত আজ সে , কবর খোঁজার পালা ,
হাঁটতে লাগলো কত কাল ধরে , পায়ে ফোস্কার জ্বালা । 
তবুও থামেনি ।  হেঁটেছে .... হেঁটেছে..... কত কিছু ঘটে রোজ ,
রাস্তায় হাঁটা পাগলীর কেউ কেন বা রাখবে খোঁজ ?

না খেতে পাওয়া শুকনো শরীরে তবু কারা খোঁজে মধু ,
যন্ত্রনা , ঘা সব সয়ে যায় , মৃত্যু হয়না তবু ।
চোখের সামনে কত কত প্রাণ মরে যায় রোজ রোজ ,
থামবে না সে , পেতেই হবে তার কবরের খোঁজ ।

জটপড়া চুল , ছেঁড়াখোঁড়া শাড়ি, ধুলোবালি মাখা মুখ ,
বসলো এসে শ্মশানের ধারে , শান্তি পেল সে খুব ।
আজ হাঁটা শেষ , এই ছিল বুঝি তার জীবনের খোঁজ !
এখানে বসবে আর উঠবে না , হাঁটবে না রোজ রোজ ।

অনেক দিনের হাঁটার পরে পায়ের ফোস্কা যেই
চোখ রেখেছে চোখে তাকে কান্না শেখাতেই ,
অমনি চোখ স্থির হয়েছে , এসেছে অন্ধকার । 
একটাই ছিল জীবন , আর মৃত্যু ?

১৪/১২/১৮

Comments

  1. ওহ অসাধারণ।তুমি নিজেকে ব্লগ এ সীমাবদ্ধ রেখো না।আরো বড় কিছুর আশায় আছি।

    ReplyDelete
  2. Replies
    1. ☹ হ্যাঁ , এটা আমার ব্লগ তো !

      Delete

Post a Comment

Popular posts from this blog

অতঃকিম : ঘোড়ার ডিম ২

আট বছর আগের একদিন

ও মাই ঘড ৭