অতঃকিম : ঘোড়ার ডিম ১
সক্কালবেলা জানলার কাছে মুখ বাড়িয়ে ডেকে উঠল : হাম্বা!
পদ্মদি বলল, “ছিঃ গোমাতা ! অমন ভুলভাল ডাকিও না! তুমি না পবিত্র গোমাতা ! গোমাতাদিগের সম্মানার্থে তোমার ‘হাম-মা’ বলিয়া ডাকা উচিত।” গোরুটা আবার চেঁচিয়ে উঠল, “হাম্বাআআআ”। পদ্মদি বলল, “আহা! এ কী অনাসৃষ্টি গোমাতা ? আমার গবাক্ষের বাহিরে দাঁড়াইয়া তুমি এমন করিতেছ কেন? ইহা করিলে তোমার আধারকার্ডাদি বাজেয়াপ্ত হইতে পারে তাহা জানো কি? সেখানে স্পষ্ট
করিয়া লিখিয়া দিয়াছে, কোনও গোমাতা ‘হাম-মা’ ভিন্ন আর কিছু বলিতে পারিবে না। তুমি
যে মায়ের জাত! তাই ‘হাম-মা’ বলিতে হইবে, এতুকু হিন্দি জ্ঞান না থাকিলে আর গোমাতা
কিসের!” গোরুটা এবার তারস্বরে চেঁচিয়ে ডেকে উঠল, “হাম্বাআআআআআ”। পদ্মদি জানলার সামনের টেবিল
থেকে বই-পত্তর তুলে অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াল। বেশ রেগে গিয়ে বলল, “এমন
অশিক্ষিত, আসভ্য গোমাতা আমি জন্মেও দেখি নাই।”
গোমাতা এবার স্পষ্ট বাংলায় বলে উঠল, “কোতায়
যাচ্চিস, চুপ করে বোস একেনে”। পদ্মদি থতমত খেয়ে চেয়ারে বসে পড়ল। বেশ আশ্চর্য হয়ে বলল, ‘একি গোমাতা ! তুমি
দেবভাষায় কথা না বলিলেও চলিবে, এমনকি ‘রাজ ভাষা’য় না বলিলেও চলিবে, কিন্তু তাহা
বলিয়া এমন প্রাকৃতজনের ভাষায় তুমি কথা বলিবে! এ যে কল্পনারও অতীত। নিদেনপক্ষে
সাধুভাষায় কথা বলিতে পারিতে !” গরু চোখ বড়বড় করে সিং নেড়ে জানলার কাছে এগিয়ে এসে বলল, ‘ইয়ার্কি
কোরতিচিস আমার সোঙ্গে? আমি দক্ষিণ ২৪পরগণার গোরু। যেখানকার মানুষদের তোরা গরু ছাগল
বলে গালাগাল দিস। আর এখন আমাকে
‘গোমাতা গোমাতা’ করে রঙ্গ কোরতিচিস ?” পদ্মদি মনে মনে মনে স্মরণ করল, “গোমাতার
শাপ, অনন্ত নরকবাস”। তাই গরুকে না চটিয়ে বলল, “না না আমি কেন তোমাকে অপমান করিব
গোমাতা ? আমি বিধানের কথা কহিতেছিলাম। বিধানে বলা আছে...’’ গরু প্রচণ্ড জোরে
চিৎকার করে ‘হাম্বাআআআআআআআআ’ বলে ডেকে উঠে বলল, “জেকেনে যাচ্চি শুধু বিদান আর বিদান...
বলি আমাদের সংবিদানটা গেলটা কোতায়?” পদ্মদি বুঝল এই গরু নেহাত অশিক্ষিত নয়, ইতিহাস
বোধ আছে। তাই খুশি মনে জবাব দিল, “আছে তো ! সংবিধানটা শুধু মাত্র ‘সং’-দের জন্য
সংরক্ষিত। সাধারণ মানুষদের জন্য ‘বিধান’।” গরু এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল কেউ নেই।
জানলার দিকে আরও এগিয়ে এসে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, ‘সং’ আবার সাজল কারা? ‘দেল
নাচ’ হবে বুঝি?” পদ্মদি বলল, “অমন কথা
কহিও না গোমাতা। ‘সং’ হওয়া মোটেই সহজ কথা নয়। সংসদভবনে বসার যোগ্যতা যিনি অর্জন
করেন, তাঁকে সম্মানের সহিত ‘সং’ উপাধি দেওয়া হয়।” গরু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “যাক
গে! এসব জেনেই বা আর কী হবে আমার? আমি একোন আর সং টং কারোর সম্পত্তি নই,পেপ্সিকোর সম্পত্তি।
নেহাত পাসপোর্টটা হয়নে বলে একেনে ওকেনে ঘুরে বেড়াচ্ছি, মনের আনন্দে ডেকে বেড়াচ্চি।
যতই বেগোড়বাঁই করি কেউ তো আর আমায় একোন পাকিস্তানে পাঠানোর হুমকি দিতি পারবেনে ! যাইহোক,
একোন বুজি, যদি হুমকির ভয়ে, যদি বিদান না মেনে, পবিত্র গোমাতা সাজার চেষ্টা না করে
আনন্দে জীবনটা কাটাতুম, তালি পেপ্সিকোর সম্পত্তি হয়ে গে এতো আফসোস হোতুনি। যাক
গে... আপনি প্রাচীন ভারতীয় গৌরবময় সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান চর্চায় মনপ্রাণ নিয়োজিত
করিয়া বসিয়া থাকুন, আমি মাঠ থেকে চাট্টে খাস খে আসিগে।”
Comments
Post a Comment